শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৫:৩৯ পিএম, ২০২৬-০৭-২০
সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, সমাজ, শরীর, স্মৃতি ও অস্তিত্বকে নতুন ভাষায় পাঠ করার একটি অনন্য উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সারাফ নাওয়ার দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকা এবং সাহিত্য সাময়িকীতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত লিখে আসা একজন জ্যেষ্ঠ ও সুপরিচিত কবি। দীর্ঘ সাহিত্যচর্চায় তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কাব্যভাষা, স্বতন্ত্র প্রতীকচেতনা এবং আধুনিক মননের এক বৈশিষ্ট্যময় কাব্যজগৎ। তাঁর ‘রাত্রির ভাটলিপি’ সেই দীর্ঘ সৃজনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই গ্রন্থে পাঠক প্রবেশ করেন কোনো সরল বয়ানের ভেতর দিয়ে নয়; বরং প্রতীক, চিত্রকল্প, নীরবতা ও বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনার এক জটিল অথচ মুগ্ধকর কাব্যভূমিতে। এখানে প্রকৃতি, প্রেম, শরীর, রাষ্ট্র, ইতিহাস, প্রযুক্তি ও সমকাল একে অপরের ভেতর দ্রবীভূত হয়ে নির্মাণ করেছে অনুভবের নতুন ব্যাকরণ।
গ্রন্থের শিরোনামই কৌতূহল জাগায়। ‘রাত্রি’ এখানে কেবল অন্ধকারের প্রতীক নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগৎ, গোপন স্মৃতি, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও অনুচ্চারিত ইতিহাসের রূপক। আর ‘ভাটলিপি’ যেন এমন এক সাংকেতিক বর্ণমালা, যার পাঠোদ্ধার করতে হলে পাঠককে শব্দের অন্তর্গত নীরবতার দিকেও কান পাততে হয়। ফলে এই কাব্যগ্রন্থ সহজপাঠ নয়; বরং ধীর, মননশীল ও পুনঃপাঠপ্রিয় পাঠকের জন্য নির্মিত।
‘জলসঙ্গম’ কবিতার কয়েকটি চরণেই কবির চিত্রকল্প নির্মাণের মুন্সিয়ানা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“অদূরেই বিকেলটি ভ্রমণে গেলে বাতাসের অসর্তকতায় / একটি ফড়িং উড়ে আসে মগ্নবাহুতিলে... / রঙিন কণ্ঠ, পুরোনো তিয়াস।”
এখানে বিকেল ভ্রমণে যায়, বাতাস অসতর্ক হয়, একটি ফড়িং এসে বসে ‘মগ্নবাহুতিল’-এ। বাস্তবের দৃশ্য মুহূর্তেই রূপ নেয় অনুভূতির ভূদৃশ্যে। প্রকৃতি এখানে নিছক অলংকার নয়; বরং মানবমনের অন্তর্লীন আবেগের ভাষা। ‘রঙিন কণ্ঠ’ এবং ‘পুরোনো তিয়াস’—এই দুটি চিত্রকল্পে স্মৃতি, প্রেম, অভাব ও অপূর্ণতার মৃদু বিষণ্নতা একাকার হয়ে যায়। অল্প কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই কবি দৃশ্যকে রূপান্তরিত করেছেন অনুভবের জলরেখায়।
গ্রন্থের নামধারী কবিতা ‘রাত্রির ভাটলিপি’ পাঠককে আরও গভীর প্রতীকময় এক জগতে নিয়ে যায়—
“আদিম শিল্পী উরুতে উল্কি আঁকে / ডুব দিয়ে রক্তকুয়োয়... / বাতাসের পর্দা বাঁধে গভীর আড়াল, বাজে বৃষ্টিসঙ্গীত / কাশফুল মুছে দেয় শঙ্খতীরের বেদনা শুভ্রতায়।”
এই কবিতায় শরীর কেবল শরীর নয়; শরীরই ইতিহাস, শিল্প, কামনা এবং সভ্যতার স্মৃতিফলক। ‘রক্তকুয়ো’, ‘কামাতুর ঝড়’, ‘বৃষ্টিসঙ্গীত’, ‘কাশফুল’ কিংবা ‘শঙ্খতীর’—প্রতিটি প্রতীক বহুস্তরীয় অর্থ বহন করে। কবি কোনো ব্যাখ্যা দেন না; বরং পাঠককে অর্থ নির্মাণের স্বাধীনতা দেন। এই উন্মুক্ত পাঠপরিসরই কবিতাটিকে আধুনিক ও বহুব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে।
‘রাত্রিবরেষু’ কবিতাটি যেন কবির নিজস্ব কাব্যদর্শনের এক সংক্ষিপ্ত ইশতেহার—
“একটি কবিতা দাবি রাখে নিরন্তর এডিটিং— / পরিচর্যারত জলে-বাতাসে / ঘুম ভাঙিয়ে আহাদ করে, চায় নিঃশব্দ সোহাগ...”
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে কবি যেন কবিতার জন্মপ্রক্রিয়াকেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কাছে কবিতা তাৎক্ষণিক আবেগের বিস্ফোরণ নয়; বরং দীর্ঘ পরিচর্যা, সংশোধন, আত্মশুদ্ধি ও নান্দনিক নির্মাণের ফল। কবিতাকে তিনি একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখেন, যে তার স্রষ্টার কাছেই বারবার ফিরে আসে আরও যত্নের প্রত্যাশায়।
অন্যদিকে ‘পরমাণুর যুগে’ কবিতাটি সমকালীন সভ্যতার রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটকে তীব্র ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছে—
“অবিশ্বাসের মধ্যম পথ... / সূর্যের জন্মেই মাথার শুল্ক চায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার / শুল্কারোপ স্তনদুগ্ধে।”
এই চিত্রকল্পগুলো রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও শোষণের নির্মম বাস্তবতাকে নতুন ভাষায় উন্মোচন করে। বিশেষ করে “শুল্কারোপ স্তনদুগ্ধে”—এই পঙ্ক্তিটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের নয়, মানুষের জন্মগত অধিকার পর্যন্ত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার এক ভয়াবহ প্রতীক। সারাফ নাওয়ার এখানে স্লোগাননির্ভর প্রতিবাদ করেন না; বরং কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পাঠকের বিবেককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন।
রাত্রির ভাটলিপি-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা। সারাফ নাওয়ার প্রচলিত বাক্যবিন্যাসকে ভেঙে শব্দের নতুন সম্পর্ক নির্মাণ করেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনো শরীরে রূপ নেয়, শরীর ইতিহাসে, ইতিহাস রাষ্ট্রে, আবার রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষের একাকিত্বে এসে মিশে যায়। এই রূপান্তরশীল কাব্যভাষাই তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
একই সঙ্গে গ্রন্থের শিরোনামগুলো—কর্পোরেট, ৫৭ ধারা, বারকোড, ছবির স্বত্বাধিকার, আমেরিকা ও ড. ইউনূস, স্বার্থের মুখাগ্নি, বৈদিককালের সন্তান, আলোর বিষাদ, সম্ভাব্য কবিতা—প্রমাণ করে, কবির ভাবনার বিস্তার ব্যক্তিগত অনুভূতি ছাড়িয়ে সমাজ, রাষ্ট্র, প্রযুক্তি, ইতিহাস ও বিশ্ববাস্তবতার দিকে প্রসারিত। ফলে এই কাব্যগ্রন্থে ব্যক্তি ও সময়ের সংলাপ সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, ‘রাত্রির ভাটলিপি’ কেবল একটি কবিতাগ্রন্থ নয়; এটি সমকালীন বাংলা কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক ও ভাবগত পরিসরে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। দীর্ঘ সাহিত্যসাধনায় অর্জিত ভাষাবোধ, প্রতীক নির্মাণের দক্ষতা এবং সময়কে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ক্ষমতা এই গ্রন্থকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। দ্রুতগতির সময়ে যখন কবিতা প্রায়ই তাৎক্ষণিক উচ্চারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সারাফ নাওয়ারের ‘রাত্রির ভাটলিপি’ পাঠককে ধীরে পড়তে, গভীরভাবে ভাবতে এবং বারবার ফিরে এসে নতুন অর্থ আবিষ্কার করতে আহ্বান জানায়। সেই অর্থে এটি শুধু একটি পাঠযোগ্য কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং সমকালীন বাংলা কবিতার মননশীল পাঠকসমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অর্জন।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited